সরকার ভর্তুকির চাপ কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে, যা ১৮ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে কার্যকর হয়েছে। নতুন দামে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের উৎপাদন কার্যক্রম অনেকাংশেই জ্বালানিনির্ভর। গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানায় বিকল্প হিসেবে ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহ সংকট থাকায় উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে অর্ডার ধরে রাখা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আগে থেকেই নির্ধারিত দামের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে রাজি নন। ফলে বাড়তি খরচ ব্যবসায়ীদের নিজেদের বহন করতে হচ্ছে। এতে অনেক ক্ষেত্রে লোকসানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কেউ কম দামে অর্ডার নিলে ক্ষতির মুখে পড়ছেন, আবার বেশি দাম চাইলে অর্ডার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
ট্যানারি খাতেও একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে সরবরাহ ঘাটতি। প্রয়োজনীয় তেল না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে জেনারেটর চালানোর প্রয়োজন হলেও তেলের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পণ্যের মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে আমদানি-রপ্তানি সবক্ষেত্রেই অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হচ্ছে। সামনে কোরবানির ঈদকে ঘিরে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ না থাকলে পুরো খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি মূল্যস্ফীতির ওপর পড়বে। পরিবহন ভাড়া, উৎপাদন ব্যয়, কৃষিপণ্যসহ সব ক্ষেত্রে খরচ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত এর চাপ সাধারণ ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়বে। ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকায় নতুন এই চাপ নিম্নআয়ের মানুষের জন্য আরও কষ্টকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
তারা আরও বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির একটি গুণক প্রভাব রয়েছে, যা পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে শুধু শিল্প নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও এর প্রভাব দেখা যাবে। এই পরিস্থিতিতে বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম বাড়ানো বাস্তবতার অংশ হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। তা না হলে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।








