রাজধানীর মিরপুর, ফকিরাপুল, বাড্ডা, রামপুরা কিংবা নতুন বাজার—সবখানেই একই দৃশ্য। হাতে কোদাল, হাতুড়ি বা ঝুড়ি নিয়ে শ্রমিকরা অপেক্ষা করেন দিনের একটি কাজের জন্য। কেউ রাজমিস্ত্রি, কেউ রংমিস্ত্রি, কেউ বা সাধারণ জোগালি—কিন্তু পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিশ্চয়তা। সকালে ভিড় বাড়ে, আশাও বাড়ে; কিন্তু দিনের শেষে অনেকেই ফিরে যান খালি হাতে।
এই চিত্রটি কেবল শ্রমবাজারের সংকট নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এটি “অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ফাঁদ” যেখানে শ্রমিকরা স্থায়ী কোনো কাঠামোর মধ্যে থাকেন না। ফলে তাদের আয়ের নিশ্চয়তা নেই, সামাজিক নিরাপত্তাও নেই। শ্রমবাজারে সরবরাহ বাড়লেও চাহিদা না বাড়ায় তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা, যা মজুরিকেও অস্থির করে তুলেছে।
রংমিস্ত্রি কামাল মিয়ার মতো অনেকেই বলছেন, এখন দুই-তিন দিন অপেক্ষা করে একদিন কাজ পাওয়া স্বাভাবিক। অন্যদিকে আল আমিনের মতো শ্রমিকদের মাসিক আয় খরচের তুলনায় অনেক কম, ফলে ধার-দেনা তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতা “ওয়ার্কিং পুওর” বা কর্মরত দরিদ্র শ্রেণির একটি স্পষ্ট উদাহরণ—যারা কাজ করেও দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারেন না।
সমাজবিজ্ঞানীরা আরও বলেন, নির্মাণ খাতে মন্দা, গ্রাম থেকে শহরে শ্রমিকের ক্রমবর্ধমান আগমন এবং বিকল্প আয়ের উৎসের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে এই সংকট তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, যা বাস্তব মজুরিকে আরও কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে শ্রমিকরা শুধু কাজের অভাবেই নয়, আয়ের অবমূল্যায়নের কারণেও চাপে রয়েছেন।
নারী শ্রমিকদের পরিস্থিতি আরও নাজুক। তারা কম কাজ পান, কম মজুরি পান, আবার সামাজিক বাধাও বেশি মোকাবিলা করতে হয়। এতে করে শ্রমবাজারে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১৮৮৬ সালের Haymarket Affair-এর স্মৃতিতে পালিত মে দিবস আজও শ্রমিক অধিকারের প্রতীক। কিন্তু ঢাকার এই দিনমজুরদের জন্য দিনটি প্রতীকী নয়, বরং বাস্তবতার নির্মম প্রতিফলন। তাদের কাছে মে দিবস মানে কোনো ছুটি নয়, বরং আরও একটি অনিশ্চিত দিন—যেখানে কাজ পেলে খাবার, না পেলে অনিশ্চয়তা।
এই বৈপরীত্যই আমাদের সামনে বড় প্রশ্ন তোলে—অধিকার প্রতিষ্ঠার যে ইতিহাস আমরা উদযাপন করি, তা কি আজকের শ্রমিকদের জীবনে বাস্তব কোনো পরিবর্তন আনতে পেরেছে? নাকি প্রতীক আর বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব এখনও ততটাই রয়ে গেছে?







