Search
Close this search box.

ম্যালেরিয়ায় বাণিজ্য সচিবের মৃত্যু

হাবিবা

ছবিঃ সংগৃহীত

বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমানের মৃত্যু প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। উচ্চপদস্থ একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন মৃত্যু শুধু দুঃখজনকই নয়, বরং বিদেশ সফর-সংক্রান্ত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

গত ১৭ এপ্রিল রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মাহবুবুর রহমান। ১৩তম বিসিএস শুল্ক ও আবগারি ক্যাডারের এই কর্মকর্তা রক্তের প্লাটিলেট কমে যাওয়ার কারণে ১৩ এপ্রিল হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে তার শরীরে ম্যালেরিয়া শনাক্ত হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৮ বছর।

জানা গেছে, গত ২৬ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত আফ্রিকার দেশ ক্যামেরুনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। দেশে ফেরার পর প্রথমে মৃদু জ্বর দেখা দিলেও দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আফ্রিকার অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার যে ধরন দেখা যায় তা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি জটিল ও প্রাণঘাতী। সরকারের ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির এপিডেমিওলজিস্ট মশফিকুর রহমান বিটু জানিয়েছেন, আফ্রিকার ম্যালেরিয়া প্যারাসাইট অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ায় চিকিৎসা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রশাসন ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে শুধু আনুষ্ঠানিক অনুমোদনই যথেষ্ট নয়; স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে ভ্রমণের আগে প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণ, প্রতিরোধমূলক ওষুধ সেবন এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ বাধ্যতামূলকভাবে নিশ্চিত করা উচিত।

সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া মনে করেন, বিদেশ সফরের আগে এবং পরে কর্মকর্তাদের জন্য বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য নির্দেশিকা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। সফর শেষে স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সামান্য উপসর্গ দেখা দিলেও দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।

অন্যদিকে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সংগঠনের নেতারা বলছেন, বিদেশ সফরে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিমালায় সুরক্ষার ঘাটতি নেই, তবে ব্যক্তিগত সচেতনতার অভাব বড় ঝুঁকি তৈরি করে। সংশ্লিষ্ট দেশের স্বাস্থ্য প্রোটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ করলেই অনেক ক্ষেত্রে এমন দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি ভ্রমণের উদ্দেশ্য, সময়কাল, ব্যয় এবং পূর্ববর্তী সফরের তথ্য বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করতে হয়। তবে এসব প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর নির্দেশনা বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, ক্যামেরুনসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ইয়েলো ফিভার টিকা বাধ্যতামূলক এবং ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে ওষুধ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। মশা থেকে সুরক্ষা নেওয়ার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এই ঘটনার পর প্রশাসনের ভেতরে বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা জোরদারের দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজন হলে ঝুঁকিপূর্ণ দেশে ভ্রমণের আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন বা পরামর্শ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

মাহবুবুর রহমানের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং প্রশাসনের জন্য একটি সতর্কবার্তা— বিদেশ সফরে অবহেলা নয়, সর্বোচ্চ সতর্কতাই হতে পারে জীবন রক্ষার একমাত্র উপায়।



সম্পর্কিত খবর

এই পাতার আরও খবর

সর্বশেষ