তদন্তে জানা গেছে, এই চক্র এককভাবে কাজ করে না; বরং একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভিন্ন ধাপে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। প্রথমে টার্গেট করা হয় নিরীহ চালকদের। এরপর নারী সদস্যদের ব্যবহার করে আবেগঘন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়—যেমন হারিয়ে যাওয়া সন্তান খোঁজার গল্প—যাতে চালক সহজেই তাদের বিশ্বাস করে। পরে খাবার বা পানীয়ের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে চালককে অচেতন করা হয়। এরপর তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে হত্যা করে লাশ গুম করা হয় নদী বা ঝোপঝাড়ে, আর রিকশাটি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয় নির্ধারিত গ্যারেজে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাজধানীর মিরপুরের বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় অন্তত পাঁচটি গ্যারেজকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে চোরাই রিকশার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এসব গ্যারেজের মালিকরা আগাম অর্থ বা ‘দাদন’ দিয়ে ছিনতাইকারী চক্রকে লালন করে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চোরাই রিকশা সরবরাহের নির্দেশ দেয়। গ্যারেজে আনার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রিকশার চেহারা বদলে ফেলা হয়, যাতে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর কম দামে কেনা রিকশা বেশি দামে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা করা হয়।
এই চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে কয়েকজন গ্যারেজ মালিকের নাম উঠে এসেছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে বৈধ ব্যবসার আড়ালে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা চক্রগুলো সাভার, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয়। মাসে কয়েক ডজন থেকে শতাধিক চোরাই রিকশা এসব গ্যারেজে এনে পুনরায় বাজারজাত করা হয়।
হুমায়ুন কবির নামে এক অটোরিকশা চালকের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে এই চক্রের অনেক তথ্য সামনে আসে। তিনি নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন পর তার মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। গ্রেপ্তার হওয়া চক্রের সদস্যরা জিজ্ঞাসাবাদে একাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।
পুলিশ জানায়, এ ধরনের অপরাধে জড়িতরা অত্যন্ত সংগঠিত এবং পরিকল্পিতভাবে কাজ করে। অনেক সময় তারা প্রতিদিনই একই ধরনের অপরাধ ঘটায়, ফলে নির্দিষ্ট ঘটনা মনে রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তথ্য-প্রযুক্তি ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এসব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি শক্তিশালী সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র, যা দমনে নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো জরুরি। একইসঙ্গে চোরাই মালামালের ক্রেতা ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে না পারলে এই অপরাধ থামানো কঠিন হবে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, ইতোমধ্যে কয়েকটি চক্র শনাক্ত করে অভিযান চালানো হয়েছে এবং আরও কয়েকটি চক্র নজরদারিতে রয়েছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।







