বিশেষজ্ঞদের মতে, থোক বরাদ্দের বড় অংশ নির্দিষ্ট প্রকল্পভিত্তিক না হওয়ায় তা প্রায়ই যথাযথভাবে ব্যবহার করা যায় না। ফলে বাজেট ঘোষণার পরও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি থেকে যায়। পরিকল্পনা কমিশন-এর তথ্য অনুযায়ী, অতীতেও বড় আকারের উন্নয়ন বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়িত হয়নি।
চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেট দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও সংশোধিত এডিপিতে তা নেমে এসেছে প্রায় দুই লাখ কোটিতে। এর মধ্যেও খরচ হয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ। আগের অর্থবছরে মোট ব্যয় হয়েছিল এক লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যা ঘোষিত বাজেটের তুলনায় অনেক কম।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বাস্থ্য বিভাগের চলমান প্রকল্পে ছয় হাজার আট কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। একইভাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে পাঁচ হাজার ৪৮ কোটি টাকার বিপরীতে থোক বরাদ্দ ১৬ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে প্রকল্পে ৩০ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা বরাদ্দের পাশাপাশি ১৩ হাজার ৯০২ কোটি টাকা রাখা হয়েছে থোক বরাদ্দ হিসেবে।
এ ছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ এবং কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা ও সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা খাতে একাই ৩৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি।
আগের অর্থবছরগুলোতে এ ধরনের থোক বরাদ্দের পরিমাণ ছিল তুলনামূলকভাবে কম। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চার হাজার ৬৯৬ কোটি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছয় হাজার ৩২৮ কোটি এবং চলতি অর্থবছরে ১০ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। সেই তুলনায় এবার হঠাৎ বড় অঙ্কের বৃদ্ধি বাজেট ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মামুন আল রশিদ মনে করেন, এডিপি প্রণয়নে একটি স্পষ্ট স্ববিরোধিতা রয়েছে। একদিকে সংশোধিত বাজেটে কাটছাঁট করা হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন অর্থবছরে আরও বড় বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে। একই জনবল ও সক্ষমতা দিয়ে এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন করা কঠিন, ফলে শেষ পর্যন্ত সংশোধিত বাজেটে আবারও কাটছাঁট করতে হতে পারে।
এদিকে অনুমোদন না পাওয়া সম্ভাব্য প্রকল্পগুলোর জন্যও বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সেতু বিভাগের জন্য দুই হাজার ১৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যদিও প্রকল্পগুলো এখনো অনুমোদন পায়নি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের বরাদ্দ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা কমিয়ে দেয় এবং বাজেট ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতার ইঙ্গিত বহন করে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, থোক বরাদ্দ কোনো সুনির্দিষ্ট খাতভিত্তিক না হওয়ায় পরবর্তীতে তা ব্যয়ের জন্য অপ্রয়োজনীয় খাত তৈরি করা হয়। এতে উন্নয়ন ব্যয়ের গুণগত মান কমে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।






