ডয়েচে ভেলের (ডিডব্লিউ) অনুসন্ধানভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ২০টিরও বেশি বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে গভীর সমুদ্র খননে অর্থায়ন না করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অন্তত ৬৮ কোটি ডলারের বেশি অর্থ এই খাতে যুক্ত কোম্পানিগুলোতে গেছে।
অজানা সমুদ্রতলে চলছে খনিজ আহরণ
ব্যাটারি, ইলেকট্রনিক্স ও শিল্পখাতে ব্যবহারের জন্য নিকেল, কোবাল্ট ও তামার মতো মূল্যবান খনিজের সন্ধানে সমুদ্রপৃষ্ঠের হাজার হাজার মিটার নিচে চলছে অনুসন্ধান ও খনন কার্যক্রম। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই গভীর সমুদ্র অঞ্চলের মাত্র খুব সামান্য অংশই এখন পর্যন্ত মানুষের পর্যবেক্ষণে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রতলের বাস্তুসংস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। সেখানে বিরাজমান প্রাণবৈচিত্র্য সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান এখনো সীমিত হলেও সেখানে বড় পরিসরে শিল্প খনন শুরু হয়ে গেছে।
ব্যাংক ও বিনিয়োগের ‘সবুজ প্রচারণা’ নিয়ে প্রশ্ন
ডয়েচে ব্যাংক, ইউবিএস, ক্রেডিট সুইস, ক্রেডিট এগ্রিকোল এবং বিএনপি পারিবাসের মতো বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই খাতে জড়িত বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরিবেশগত অঙ্গীকার থাকলেও এসব ব্যাংকের বিনিয়োগ নীতির সঙ্গে বাস্তব কার্যক্রমের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটি অনেক ক্ষেত্রেই “গ্রিনওয়াশিং”—অর্থাৎ পরিবেশবান্ধব ভাবমূর্তি তৈরি করে বাস্তবে পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন চালিয়ে যাওয়া।
গ্রিনপিসের সাবেক ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট মাউরিসিও ভার্গাস বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশগত বিতর্ক এড়াতে কৌশলী ভাষায় নীতিমালা তৈরি করে, কিন্তু বাস্তবে লাভজনক খাতে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখে।
বিজ্ঞানীদের কঠোর সতর্কতা
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী দিভা আমন বলেন, গভীর সমুদ্র পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সবচেয়ে কম বোঝা বাস্তুসংস্থান। এখানে কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটলে তার প্রভাব অপরিবর্তনীয় হতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “আমরা এমন এক জগত ধ্বংসের পথে যাচ্ছি, যা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানই খুব সীমিত। একবার ক্ষতি হলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।”
বৈশ্বিক বিরোধিতা ও স্থগিতাদেশের দাবি
এ পর্যন্ত প্রায় ৪০টি দেশ আন্তর্জাতিক জলসীমায় গভীর সমুদ্রে খনন কার্যক্রম স্থগিত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, পরিবেশগত ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে বোঝার আগে এই ধরনের কার্যক্রম শুরু করা উচিত নয়।
জাতিসংঘের বিশেষ দূত পিটার থমসন ১০ বছরের স্থগিতাদেশের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে সমুদ্রবিজ্ঞানীরা পর্যাপ্ত গবেষণা করে এর বাস্তব প্রভাব মূল্যায়ন করতে পারেন।
জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ হুমকি
গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষামূলক খননের পর সমুদ্রতলের প্রাণবৈচিত্র্য এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি কমে গেছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে বহু অজানা প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে, যাদের মধ্যে অনেকগুলো ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গভীর সমুদ্রের বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হলে তার প্রভাব শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং চিকিৎসা, খাদ্য নিরাপত্তা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করবে।








