Search
Close this search box.

মধ্যযুগের বিস্ময়কর এক প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যানে

অহনা

কম্বোডিয়া দেশটির পতাকা খেয়াল করেছেন কখনো? পতাকায় একটি বিশেষ মন্দিরের ছবি। এটি কম্বোডিয়ানদের কাছে এতই পবিত্র আর সম্মানের যে মন্দিরটি স্থান পেয়েছে তাদের জাতীয় পতাকায়। কোনো দেশের জাতীয় পতাকায় স্থান পাওয়া পৃথিবীর একমাত্র স্থাপত্যই হলো এই অ্যাংকর ওয়াত। এগারো শতকে এই মন্দিরকে কেন্দ্র করেই একটি সভ্যতা গড়ে উঠেছিল

কম্বোডিয়ার সিয়াম রিপ শহরে এই রাজ্যের অবস্থান। মধ্যযুগে জঙ্গল কেটে গড়ে উঠেছিল এক বিস্ময়কর স্থাপনা অ্যাংকর ওয়াত। স্থানীয়রা এই মন্দির চত্বরকে বলেন জঙ্গলরাজ্য। পুরো সিয়াম রিপ শহরটিকে আমার মনে হয়েছে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যান।

 

 

মধ্যযুগের বিস্ময়কর এক প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যানে

প্রম টেম্পলজুড়ে স্পুংগাছ। এই গাছ শিকড় ও কাণ্ড দিয়ে পুরো টেম্পলকে ঢেকে রেখেছে

কম্বোডিয়া ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্যই ছিল অ্যাংকর ওয়াত দেখা, যদিও ভ্রমণ শুরু করেছিলাম কম্বোডিয়ার রাজধানী শহর নমপেন দিয়ে। নমপেন থেকে সিয়াম রিপ যাওয়ার দুটি উপায়—সড়কপথ ও বিমানযোগে। আমি গিয়েছিলাম সড়কপথে, সময় লেগেছিল প্রায় আট ঘণ্টা।

কম্বোডিয়ার ২৫টি প্রদেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপপূর্ণ ও জনপ্রিয় প্রদেশ সিয়াম রিপ। অ্যাংকর ওয়াত চত্বরে ঢুকতে হলে টিকিট কাটতে হবে। ট্যুরিস্টের ছবি সংযুক্ত থাকে টিকিটের গায়ে। টিকিট কাউন্টারেই ছবি তোলা হবে। পুরো চত্বর ঘুরে দেখার জন্য অনেক অপশন—এক দিনের টিকিট, তিন দিন ও সাত দিনের।
আমি করেছিলাম তিন দিনের টিকিট। 

অ্যাংকর ওয়াতের সামনে লেখক

অ্যাংকর ওয়াতের সামনে লেখক

চত্বরটি এত বড় যে হেঁটে দেখা প্রায় অসম্ভব। এখানে ঘুরে বেড়ানোর জন্য রয়েছে টুকটুক নামের বাহন। এই শহরে এটি বেশ জনপ্রিয়। দেখতে অনেকটা আমাদের দেশের অটোরিকশার মতো।

অ্যাংকর ওয়াত এলাকাটি পাঁচ ভাগে বিভক্ত। পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ ও সেন্ট্রাল অ্যাংকর। পুরো চত্বরে মোট মন্দিরের সংখ্যা প্রায় ৪৫। আমি দেখেছি শুধু সেন্ট্রাল অ্যাংকরের পাঁচটি মন্দির। সেন্ট্রাল অ্যাংকরে মন্দির ১৮টি। এই রাজ্যের আয়তন প্রায় ৫০০ একর বলা হলেও এটি নিয়ে এখনো সন্দেহ আছে গবেষকদের। মন্দিরগুলোর নিয়ে বলার আগে অ্যাংকর ওয়াত গড়ে ওঠার গল্পটা একটু বলে নিই।

জানা যায়, খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে এই অঞ্চলে খেমার জাতির বাস ছিল। অষ্টম শতকে এই অঞ্চল শাসন করেন রাজা জয়বর্ধন। এই সাম্রাজ্যের সীমানা ছিল দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে লাওস ও মেকং নদী থেকে পূর্ব মিয়ানমার (বার্মা) পর্যন্ত। এই সাম্রাজ্যের রাজা প্রায় ৩৮ জন। ১১ থেকে ১৫ শতকের মধ্যে অ্যাংকর ছিল পৃথিবীর অন্যতম বড় শহর। অষ্টম থেকে ১২ শতক পর্যন্ত ছিল এই সভ্যতার স্বর্ণযুগ। এই মন্দিরগুলো কেবল উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো তাই নয়, এগুলো ছিল দেবতাদের বাসস্থান। অ্যাংকর ওয়াতের রাজাদের মনে করা হতো দেবতা।

মধ্যযুগের বিস্ময়কর এক প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যানে

অ্যাংকর থমে আছে টেরাস অব দ্য এলিফ্যান্ট, টেরাস অব দ্য লেপার কিং, প্রিচ ফিলাই

বাস্তুশাস্ত্র আর নগর পরিকল্পনায় খেমার রাজাদের দক্ষতা আজও বিস্ময় জাগায়। এই জঙ্গলরাজ্য পরিবেষ্টিত ছিল পরিখা বা খাল দিয়ে, যা একদিকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করত, অন্যদিকে এই জলপথ ব্যবহৃত হতো পরিবহন আর বাণিজ্যিক কাজে। খেমাররা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্ত ছিল। কৃষিকাজের পাশাপাশি তারা ব্রোঞ্জের মূর্তি, হাতির দাঁত ও কাঠ রপ্তানি করত। পুরো এলাকায় রয়েছে বিশাল বিশাল ওকগাছ। খেমাররা মূলত চীনাদের সঙ্গে ব্যবসা করত। ১২৯৬ সালে জো ডাং ওয়াং নামের একজন চীনা ব্যবসায়ী অ্যাংকর ওয়াত ভ্রমণ করেন। তাঁর ভ্রমণ গল্প থেকেই মূলত অ্যাংকর ওয়াত সম্পর্কে এই তথ্যগুলো জানা গেছে। দ্বিতীয় শতক থেকে সপ্তম শতক পর্যন্ত খেমাররা ছিল হিন্দু ধর্মের অনুসারী। রাজা সপ্তম জয়বর্ধন বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন। এই ধর্মীয় রাজনীতির বদল হওয়ার কারণে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে এই সভ্যতা বিলীন হতে থাকে। জঙ্গল থেকে যে রাজ্যের শুরু হয়, আবার তা জঙ্গলেই ঢেকে যায়।

অ্যাংকর ওয়াতের মূল আকর্ষণ এর কেন্দ্রীয় মন্দির। মন্দিরটি দুই ভাগে বিভক্ত, একটি অংশ পাহাড়ের মতো উঁচু, অন্যটি গ্যালারির মতো। মন্দিরের চারদিকে রয়েছে পরিখা। হিন্দু ধর্মের পৌরাণিক কাহিনির দেবতাদের আবাসস্থলের অনুরূপে বানানো হয়েছে এটি। উৎসর্গও করা হয়েছে হিন্দু দেবতা বিষ্ণুকে। আয়তনের বিচারে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মন্দির। প্রতিবছর দশ লাখ পর্যটক এই মন্দির দেখতে আসে। এটি কম্বোডিয়ার প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। ১৯৯২ সালে মন্দিরটি ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রাজা দ্বিতীয় সূর্যবর্মণ ছিলেন দেবতা বিষ্ণুর ভক্ত। তিনি সব সময় বিষ্ণু দেবের পূজা করতেন। তাই এই অ্যাংকর ওয়াতের কেন্দ্রীয় মন্দিরে একটি বিষ্ণুমূর্তি স্থাপন করা হয়। খেমার রাজারা নিজেদের দেবতা মনে করতেন, তাই এই মন্দিরগুলোতেই বসবাস করতেন। রাজার মৃত্যুর পর সেই মন্দির স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এভাবে প্রতিটি রাজাই নিজস্ব মন্দির গড়ে তোলেন। কেন্দ্রীয় মন্দিরে ১২ হাজার লোক বসবাস করত। পুরোহিতরা ছিল ধর্মচর্চার জন্য, আর অপ্সররা ছিল সংস্কৃতিচর্চার জন্য।

কেন্দ্রীয় অ্যাংকর ওয়াত ভ্রমণে অ্যাংকর থম মন্দির, বাপুন, ব্যয়ন, ফিমেন আকাশ মন্দিরও দেখেছি। নির্মাণশৈলীতে প্রতিটিই বিস্ময়কর। অ্যাংকর থমও একটি শহর। অ্যাংকর অর্থ শহর, আর থম অর্থ বড়। অ্যাংকর থমের প্রতিষ্ঠাতা রাজা সপ্তম জয়বর্ধন। আমার সব থেকে বিস্ময়কর লেগেছে এর প্রবেশদ্বার। দ্বারে দেবতাদের বিশাল বিশাল মূর্তিগুলো যেন এখনো পাহারা দিচ্ছে এই শহর। এ রকম নাকি পাঁচটি গেট আছে। আমি খুঁজে পাইনি। ভেতরে ঢুকলে আসলে ধাঁধার মতো লাগে। এত বিশাল পরিসরে নিজেকে পথভ্রষ্ট মনে হয়। অবশ্য এই চত্বরের মজাই এটা।

অ্যাংকর থমের ভেতরেই আছে টেরাস অব দ্য এলিফ্যান্ট, টেরাস অব দ্য লেপার কিং, প্রিচ ফিলাই। প্রতিটি নাম উচ্চারণ করতে আমার প্রথমে কষ্ট হচ্ছিল। সবকিছুই আসলে নোটডাউন করতে হয়েছে। সেই ডায়েরি ধরেই লিখছি।

দেয়ালে আঁকা অপ্সরা, বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি, খেমার দেবতাদের নিয়ে কথা-উপকথাগুলো পাথরে লিপিবদ্ধ করার প্রথা দেখে একে আমার কোনো অংশেই মিসরীয় সভ্যতার থেকে কম কিছু মনে হয়নি। আর এই সভ্যতাকে জঙ্গলরাজ্য বলা খুবই যথার্থ। কারণ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমি কিছুটা হলেও সেই জঙ্গলরাজ্যের আভাস পাচ্ছিলাম এবং পাথর খোদাইয়ের খেমারদের পারদর্শিতার কথা চিন্তা করে বিস্মিত হচ্ছিলাম।

অ্যাংকর ওয়াত ও অ্যাংকর থম চত্বরে বিচিত্র সব উদ্ভিদ রয়েছে। মন্দিরগুলোর জন্য একে আর্কিওলজিক্যাল পার্ক আর উদ্ভিদের জন্য একে বোটানিক্যাল গার্ডেন বললে ভুল হবে না। সব উদ্ভিদের নাম জানা হয়নি। একবার ভ্রমলে সেটি সম্ভবও নয়। ওক গাছের কথা আগেই বলেছি। আর একটি অদ্ভুদ গাছের কথা বলছি— স্পুংগাছ।

স্পুংগাছ দেখতে পেয়েছি প্রম টেম্পলজুড়ে। এই গাছ শিকড় ও কাণ্ড দিয়ে পুরো টেম্পলকে ঢেকে রেখেছে। পুরনো টেম্পলের গায়ে রুপালি শাখা-প্রশাখা এক অন্য রকম মাত্রা তৈরি করেছে। সত্যি কথা বলতে, স্পুংগাছ অ্যাংকর ওয়াতের জনপ্রিয়তা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আরো একটি কারণ অবশ্য আছে। এখানেই ২০০১ সালে হলিউডের ‘টুম্ব রাইডার’ ছবির শুটিং হয়েছিল। স্পুংগাছকে বিশ্ব পর্যটকদের মাঝে জনপ্রিয় করেছে ছবিটি। স্পুংগাছের উচ্চতা ১০ থেকে ৭০ ফুট পর্যন্ত হয়। স্পুংগাছ পর্যটকদের মাঝে এতই জনপ্রিয় হয়েছে যে ছবি তোলার জন্য আলাদা কর্নার তৈরি হয়েছে। সেখানে রীতিমতো লাইনে দাঁড়াতে হয় ছবি তোলার জন্য। ফ্রান্স কম্বোডিয়া শাসন শুরু করলে ১৮৬০ সালে ফ্রান্সের একদল উদ্ভিদ বিজ্ঞানী জঙ্গলে খুঁজে পান এই নগরী। এই সভ্যতার পুরো স্বাদ সেখানে ভ্রমণ করলেই শুধুমাত্র পাওয়া যাবে।

সিয়াম রিপে আরো কিছু পুরনো মন্দির রয়েছে। যেগুলো গবেষকরা বলছেন অ্যাংকর ওয়াতের থেকেও পুরনো। এ রকমই একটি মন্দির প্রেহ খান মন্দির। অ্যাংকর ওয়াত থেকে ৩০ মিনিটের মতো সময় লেগেছে এখানে যেতে। প্রে খান কথাটির অর্থ ইংরেজি করলে দাঁড়ায় ‘দ্য সিক্রেট সোল’। খেমার রাজা সপ্তম জয়বর্ধন এটি নির্মাণ করেন। মূলত গৌতম বুদ্ধের স্মৃতির উদ্দেশ্যেই নির্মিত এটি। এটিও একটি ছোটখাটো শহর, প্রাচীর দিয়ে ঘেরা দুর্গের মতোও বলা যায়। দুর্গ দেয়ালের বাইরে কাঠের ঘরবাড়ি ছিল, যেখানে সাধারণ জনগণ বাস করত। সে সবকিছুই নেই এখন। কেবল টিকে আছে দৃষ্টিনন্দন পাথরের কাঠামো। এখানে একটি নাচঘর আছে। সেই দেয়ালে আঁকা আছে নৃত্যরত অপ্সরাদের ছবি। ১৯৩৯ সালে ফ্রেন্স গবেষক মরিস গ্লিস যিনি অ্যাংকর ওয়াতের সংস্কার করেন, তিনিই খুঁজে বের করেন প্রেহ খান মন্দির এবং নিরূপণ করেন এর প্রাচীনত্ব।

প্রতিটি মন্দিরের চত্বর অনেক বড়, আর এর প্রতিটি দেয়ালের গায়ে আঁকা শত শত বছরের গল্প আর ইতিহাস। সেখানে ঘুরতে ঘুরতে মনে হয়, যেন সেই পুরনো সময়েই বিচরণ করছি। আচমকা যখন একটি পাথরে হোঁচট খাবেন তখনই আপনি বর্তমানে ফেরত আসবেন।

 

বানতাই স্রেই বা পিংক টেম্পল

বানতাই স্রেই শহরের পিংক টেম্পল সিয়াম রিপ শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে। কেউ কেউ একে ওমেনস টেম্পলও বলেন। বানতে স্রেই সিয়াম রিপ প্রদেশের একটি জেলা শহর। কারণ হলো, মন্দিরের গায়ে অসম্ভব সুন্দর, সুনিপুণ এবং সূক্ষ্ম কারুকাজ করা। আসলে এর সঠিক নাম জানা যায়নি। নির্মাণকাল দশম শতক। বলা হয়, কম্বোডিয়ার সব থেকে প্রাচীন মন্দিরের অন্যতম এটি।

মন্দিরে ঢুকতেই লাভা পাথরের একটি পথ চোখে পড়ে, সেই পথ ধরেই মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়। মন্দির চত্বরে চারদিকে এদিক-সেদিক পাথর ছড়িয়ে আছে। সেই পাথরগুলো জড়ো করে গুছিয়ে রাখা আছে। পাথরের ধ্বংসাবশেষগুলো ভিন্ন একটি মাত্রা তৈরি করেছে মন্দির চত্বরে।

সিয়াম রিপ শহরের মন্দিরগুলো তৈরি হয়েছে বেলে পাথর আর লাভা পাথর দিয়ে। বেলে পাথর ব্যবহৃত হয়েছে ভাস্কর্য নির্মাণ আর দেয়ালের গায়ে ইতিহাস তুলে ধরার কাজে। আর লাভা পাথর ব্যবহৃত হয়েছে মন্দিরগুলোর বাইরের চত্বরে বাউন্ডারি হিসেবে, দেয়াল বানানোর কাজ আর আর মন্দিরের মূল ভিত্তির কাজে।

সম্পর্কিত খবর

এই পাতার আরও খবর

সর্বশেষ