Search
Close this search box.

মব-সন্ত্রাসে বিপন্ন শিক্ষাগুরু: জোরপূর্বক পদত্যাগ আর লাঞ্ছনার শিকার ৩০০০ শিক্ষক

অহনা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে শুরু হওয়া ‘মবোৎসব’-এর বলি হয়েছেন কয়েক হাজার শিক্ষক। দুর্নীতির অভিযোগ বা রাজনৈতিক তকমা দিয়ে মানুষ গড়ার কারিগরদের ওপর চালানো হয়েছে নজিরবিহীন শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন। কালের কণ্ঠের সাত দিনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব শিক্ষকের মানবেতর জীবন আর বিচারহীনতার নিষ্ঠুর চিত্র।

যদিও সরকারি কোনো দপ্তরে (মাউশি বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়) মবের শিকার হওয়া শিক্ষকদের সুনির্দিষ্ট তালিকা নেই, তবে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে:

প্রায় ৩,০০০ শিক্ষক (শিক্ষক জোটের দাবি সংখ্যাটি ৪,৫০০)।এখনো প্রায় ৭০০ শিক্ষকের বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে।প্রায় ২,১০০ শিক্ষকের বেতন চালু হলেও সামাজিক ও স্থানীয় বাধায় তাঁরা কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না।জোরপূর্বক পদত্যাগ অবৈধ ঘোষণা করা হলেও মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনের অসহযোগিতায় শিক্ষকরা সুরক্ষা পাচ্ছেন না।

গৌরনদী: সপরিবারে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলেন প্রণয় কান্তি

২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট বরিশালের গৌরনদীতে ‘মাহিলাড়া এএন মাধ্যমিক বিদ্যালয়’-এর প্রধান শিক্ষক প্রণয় কান্তি অধিকারীকে সপরিবারে স্টাফ কোয়ার্টারে আটকে ফেলে শতাধিক ব্যক্তি। ৫ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের এক ভিডিওতে দেখা যায়, বদ্ধ ঘরে তাঁরা বাঁচার জন্য আর্তনাদ করছেন। ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে সেনাবাহিনী গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করলেও পরে তাঁকে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়।

ভিকারুননিসা: ব্যক্তিস্বার্থ আর অ্যালামনাই মব

রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী ও ড. ফারহানা খানমকে প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও কয়েকজন শিক্ষকের মদদে মব সৃষ্টি করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। অভিযোগ আছে, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম ও তাঁর সহযোগীরা ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য বহিরাগতদের উসকে দিয়েছিলেন। আদালত ও মন্ত্রণালয় পুনর্বহালের নির্দেশ দিলেও তাঁরা এখনো যোগ দিতে পারেননি।

উত্তর কাফরুল: ওড়না-জামা ধরে টানাটানি

উত্তর কাফরুল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাম্মী আক্তারকে ২৯ ডিসেম্বর একদল শিক্ষার্থী ও বহিরাগত জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, তাঁর হাত ও ওড়না ধরে টানাহেঁচড়া করা হচ্ছে এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হচ্ছে।

নওগাঁ ও নোয়াখালী: মারধর ও জামা ছিঁড়ে ফেলা

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে প্রধান শিক্ষক ইউনুস নবীকে শিক্ষা কর্মকর্তার সামনেই জামা-কাপড় ছিঁড়ে মারধর করে বের করে দেওয়া হয়। একইভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলার মতো জঘন্য ঘটনা ঘটেছে।

৩. মবের নেপথ্যে যে কারণগুলো সক্রিয় ছিল

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ মবের পেছনে কাজ করেছে তিনটি প্রধান কারণ:

১. পদ দখল: সহকারী প্রধান শিক্ষক বা সিনিয়র শিক্ষকদের প্রধান হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

২. ব্যক্তিস্বার্থ: স্কুলের টেন্ডার, কেনাকাটা বা ম্যানেজিং কমিটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা।

৩. রাজনৈতিক উসকানি: শিক্ষার্থীদের ‘আবু সাঈদের অবমাননা’ বা ‘স্বৈরাচারের দোসর’ তকমা দিয়ে উত্তেজিত করা।

ভুক্তভোগী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান ভুক্তভোগী বর্তমান অবস্থা
মাহিলাড়া এএন স্কুল প্রণয় কান্তি অধিকারী নির্বাসিত জীবন, বেতন চালু হলেও স্কুলে যেতে পারছেন না।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল কেকা রায় চৌধুরী বেতন বন্ধ, যোগদানে কর্তৃপক্ষের বাধা।
নরোত্তমপুর উচ্চ বিদ্যালয় ইউনুস নবী শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত, স্কুলে প্রবেশাধিকার নেই।
সূয়াপুর নান্নার কলেজ আনোয়ারুল ইসলাম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হয়েও মবের কারণে পদচ্যুত।
শরিকল মাধ্যমিক বিদ্যালয় কণিকা মুখার্জী প্রাণনাশের হুমকি ও লাঞ্ছনার শিকার, বেতন বন্ধ।

৪. প্রশাসনিক স্থবিরতা ও শিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্য

তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ মব-সন্ত্রাসকে ‘চর দখলের’ সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। মাউশি থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, শিক্ষকদের যোগদানে বাধা দিলে সংশ্লিষ্টদের বেতন বন্ধ করা হবে। তবে বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই নির্দেশনা শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

সম্পর্কিত খবর

এই পাতার আরও খবর

সর্বশেষ