বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায় ১৪ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২ হাজার টন ডিজেল ব্যবহৃত হচ্ছে, যা কৃষি, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যবহৃত হয়। অকটেনের মজুত রয়েছে প্রায় ৯ দিনের এবং পেট্রলের মজুত প্রায় ১১ দিনের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। অন্যদিকে ফার্নেস তেল, জেট ফুয়েল, কেরোসিন ও মেরিন ফুয়েলের মজুত তুলনামূলক বেশি থাকলেও এসব জ্বালানির চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম এবং নির্দিষ্ট খাতে সীমাবদ্ধ।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর হরমুজ প্রণালি অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশে জ্বালানি আমদানির পূর্বনির্ধারিত সূচি এলোমেলো হয়ে যায়। চলতি মাসে নির্ধারিত ১৭টি জাহাজের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৮টি দেশে পৌঁছেছে। বাকি জাহাজগুলোর বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় প্রায় দেড় লাখ টন জ্বালানি তেল পাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বড় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও সময়মতো সরবরাহ দিতে পারছে না বলে জানিয়েছে।
অপরিশোধিত তেল আমদানির ক্ষেত্রেও জটিলতা দেখা দিয়েছে। নির্ধারিত কয়েকটি চালান বাতিল বা বিলম্বিত হওয়ায় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে মজুত থাকা প্রায় ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল দিয়ে সীমিত সময়ের জন্য উৎপাদন চালানো সম্ভব হবে। নতুন চালান সময়মতো না এলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে পরিস্থিতির প্রভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাপ বেড়েছে। অনেক জায়গায় পেট্রল ও অকটেনের ঘাটতির কারণে পাম্প বন্ধ রাখতে দেখা গেছে। কোথাও আবার দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। আতঙ্কে অনেক মানুষ স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তেল কিনে মজুত করার চেষ্টা করায় সরবরাহব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
সরকার বলছে, দেশে এখনো বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি এবং চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে কিছু জাহাজ এসেছে এবং আরও কিছু আসার কথা রয়েছে। প্রয়োজনে খোলাবাজার থেকেও জ্বালানি সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি এপ্রিল ও মে মাসের জন্য নতুন আমদানি পরিকল্পনা করা হয়েছে, যদিও তার সবটুকু এখনো নিশ্চিত হয়নি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান মজুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় যথেষ্ট হলেও একাধিক চাপ একসঙ্গে কাজ করায় ঝুঁকি বাড়ছে। জাহাজ আসতে বিলম্ব, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। তারা কৃত্রিম সংকট রোধে নজরদারি জোরদার এবং প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে রেশনিং ব্যবস্থার কথাও বলছেন।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত এখনো পুরোপুরি ফুরিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, তবে সরবরাহের ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হলে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে পারে। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত আমদানি নিশ্চিত করা এবং বাজারে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিপিসি সূত্র বলছে, দেশে জ্বালানি ব্যবহারের বড় অংশই ডিজেলনির্ভর। কৃষি সেচ, সড়ক পরিবহন, এমনকি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ডিজেলের ওপর নির্ভরতা বেশি। তাই ডিজেলের বাজারে চাপ বাড়লে তার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিজেল সংরক্ষণের মোট সক্ষমতা ৬ লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ টন। গতকাল পর্যন্ত সরবরাহযোগ্য মজুত ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার টন, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ২৯ শতাংশ। এই মজুত দিয়ে প্রায় ১৪ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব।
১ মার্চ থেকে গত রোববার পর্যন্ত দেশে ডিজেল বিক্রি হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬৪ হাজার টন। সে হিসাবে দৈনিক গড় বিক্রি প্রায় ১২ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল সাড়ে ১২ হাজার টনের কাছাকাছি।
দেশে অকটেনের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৫৩ হাজার ৬১৬ টন। বর্তমানে মজুত আছে প্রায় ১১ হাজার টন, যা দিয়ে প্রায় ৯ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। পেট্রলের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩৭ হাজার ১৩ টন। এর মধ্যে মজুত রয়েছে ১৬ হাজার ৬০৫ টন, যা দিয়ে প্রায় ১১ দিন সরবরাহ বজায় রাখা যাবে।
আর ফার্নেস তেলের মজুত রয়েছে ৭০ হাজার ৮৩৩ টন, যা দিয়ে প্রায় ২৯ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। আর জেট ফুয়েলের মজুত ৩৪ হাজার ৮৭৭ টন, যা দিয়ে প্রায় ২৩ দিন সরবরাহ চালানো যাবে। কেরোসিনের মজুত ৮ হাজার ৫৭১ টন, যা দিয়ে ৪৬ দিন চাহিদা মেটানো যাবে। মেরিন ফুয়েলের মজুত আছে প্রায় দেড় হাজার টন, যা দিয়ে ৪৪ দিন সরবরাহ সম্ভব।
অন্যদিকে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বর্তমানে ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুত আছে। দৈনিক গড়ে সাড়ে ৪ হাজার টন শোধনক্ষমতা বিবেচনায় এই মজুত দিয়ে আরও ১৭ থেকে ১৮ দিন উৎপাদন চালানো সম্ভব। তবে নতুন চালান সময়মতো না এলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানি স্বাভাবিক থাকলে এই মজুত ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট। কিন্তু জাহাজ আসতে দেরি হওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং আতঙ্কে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়া—এই তিনটি চাপ একসঙ্গে তৈরি হওয়ায় ঝুঁকি বেড়েছে।
এদিকে যুদ্ধ শুরুর পর দেশের জ্বালানি আমদানির পূর্বনির্ধারিত সূচি এলোমেলো হয়ে গেছে। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল নিয়ে মোট ১৭টি জাহাজ আসার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গতকাল পর্যন্ত দেশে পৌঁছেছে ৮টি জাহাজ, যেগুলো থেকে প্রায় ২ লাখ টন তেল পাওয়া গেছে।
আরও দুটি জাহাজ আসার কথা থাকলেও বাকি ৬টি জাহাজের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি বিপিসি। ফলে প্রায় দেড় লাখ টন জ্বালানি তেল পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিপিসির নথি অনুযায়ী, বড় দুই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান (চীনের ইউনিপেক ও মালয়েশিয়ার পেটকো ট্রেডিং) ইতিমধ্যে জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তারা নির্ধারিত সময় মেনে তেল সরবরাহ করতে পারছে না। তবে এই ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে ভারত থেকে পাইপলাইনে ১০ হাজার টন তেল এসেছে, আর এ মাসে আরও ৫ হাজার টন আসতে পারে।
অবশ্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আগামী মাসে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনার নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রতি ব্যারেলে অতিরিক্ত ২৫ সেন্ট বেশি খরচ করতে হবে সরকারকে।






