Search
Close this search box.

৯ মাসেই ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াল সরকার

হাবিবা

ছবিঃ সংগৃহীত

চলতি অর্থবছরের মাত্র ৯ মাসেই ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে সরকার, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সর্বশেষ প্রভিশনাল তথ্য অনুযায়ী, ৩০ মার্চ পর্যন্ত সরকারের নিট ব্যাংক ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ছয় হাজার ৫০ কোটি ৬১ লাখ টাকা, যেখানে পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বাজেট বছরের শেষ প্রান্তিকে পৌঁছানোর আগেই প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে।

এই ঋণ বৃদ্ধির ফলে সরকারের মোট ব্যাংক ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ২০২৫ সালের জুন শেষে এ পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের এই অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা ব্যাংকিং খাতে একটি পরিচিত প্রভাব সৃষ্টি করছে, যাকে বলা হয় Crowding Out Effect। এর ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিল্প, বাণিজ্য ও উৎপাদনমুখী খাতে নতুন বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। এতে কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কাঠামোগত কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি, উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, ভর্তুকির চাপ, পরিচালন ব্যয়ের বিস্তার এবং বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার কারণে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন। বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর রাজস্ব সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে থাকায় সরকারকে ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও সরকারের ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, যা জুন ২০২৫-এ ছিল ৯৮ হাজার ৪২৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ওভারড্রাফট খাতে ঋণের পরিমাণই ৩১ হাজার ৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা আগে ছিল শূন্য। এটি ইঙ্গিত করছে যে, রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান মেটাতে সরকার স্বল্পমেয়াদি তারল্য সহায়তার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে।

ব্যাংকের বাইরে অন্যান্য উৎস থেকেও সরকার ঋণ সংগ্রহ করছে। ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক-বহির্ভূত উৎস থেকে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪২ হাজার ৮০৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এতে বীমা কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ রয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, সরকারের এই ঋণ প্রবণতা বেসরকারি খাতের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ব্যাংকগুলোর একটি বড় অংশের তহবিল এখন সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ হওয়ায় উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং আমদানিকারকদের জন্য ঋণপ্রবাহ সীমিত হয়ে পড়ছে। এর ফলে তিনটি বড় প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে—ঋণের সুদহার বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ধীরগতি।

এছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতোমধ্যে নিম্নমুখী। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন ঋণ নিতে অনাগ্রহী হয়ে উঠছেন। এর সঙ্গে সরকারের বাড়তি ঋণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

মূল্যস্ফীতির দিক থেকেও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ বৃদ্ধি অর্থ সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে। বিশেষ করে খাদ্য, জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বেশি থাকলে এই চাপ আরও তীব্র হতে পারে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের উচিত রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সংকোচন, ব্যাংক-বহির্ভূত উৎস থেকে ঋণ বাড়ানো এবং বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করা।

সবমিলিয়ে, অর্থবছরের শেষ হওয়ার আগেই ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করা সরকারের আর্থিক চাপের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে। তবে এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে বেসরকারি খাতে, যেখানে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান নতুন করে চাপে পড়ছে।



সম্পর্কিত খবর

এই পাতার আরও খবর

সর্বশেষ