প্রথম নকশা তৈরি করেছিলেন ছাত্র বদরুল আলম। তৎকালীন নেতৃত্বস্থানীয় ছাত্ররা নকশা পরিমার্জন করে, বদরুল আলম ও সাঈদ হায়দারের যৌথ প্রচেষ্টায় দ্বিতীয় নকশা গ্রহণ করা হয়। নির্মাণকাজ চলাকালে ছাত্ররা সারিবদ্ধভাবে ইট ও বালি, পানি বহন করে রাতের আঁধারে ১২নং ব্যারাকের সামনে মিনারটি দাঁড় করান। এর ওপর লেখা হয় ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’। পরেরদিন শহীদ শফিউর রহমানের পিতা এবং তৎকালীন সম্পাদকরা উদ্বোধন করেন।
নির্মাণের মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই প্রথম শহীদ মিনার পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। ট্রাকভর্তি পুলিশ, বেলচা, শাবল ও গাইতি ব্যবহার করে মিনার ভেঙে ফেলা হয়। রাজশাহী, নড়াইল, বগুড়া প্রভৃতি শহরে ছাত্ররা ছোট শহীদ মিনার নির্মাণ করলেও পুলিশ তা ভেঙে ফেলে। কবি আলাউদ্দিন আল আজদা লিখেছিলেন, ‘ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক, একটি মিনার গড়েছি আমরা চার কোটি কারিগর।’
১৯৫৩ সালে সারা পূর্ববাংলায় ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়। কালো পতাকা ঘেরা মাটিতে পুষ্পমাল্য দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। প্রভাত ফেরি, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার পর্ব এই সময় থেকেই শুরু হয়।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৫৭ সালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কাজ শুরু হলেও ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন শুরু হলে নির্মাণ স্থগিত থাকে। মিনারের স্থাপত্য নকশার দায়িত্ব পান শিল্পী হামিদুর রহমান ও নারী-ভাস্কর নভেরা আহমেদ। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের উত্তাপের মাঝে শহীদ মিনারের কাজ শেষ করতে তৎকালীন গভর্নর আজম খান নির্দেশ দেন। ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নবনির্মিত শহীদ মিনারের উদ্বোধন হয়।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যূত্থানের সময়ে শহীদ মিনার এক অভূতপূর্ব গণসমাবেশের কেন্দ্রবিন্দু হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনে এই মিনার বাঙালিকে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ২৫ মার্চ ১৯৭১ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শহীদ মিনার গুড়িয়ে দেয়। মিনারের পাশেই মসজিদ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে মিনারের ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করে পুনর্নির্মাণ শুরু হয়। ১৯৭৩ সালের আগে মিনার পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং পরে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময় সংস্কার করা হয়।
শহীদ মিনার বারবার আক্রমণের শিকার হলেও বাঙালির হৃদয়ে একুশের আত্মদানের স্মৃতি অটুট থেকে গেছে। এটি এখনও প্রতিবাদের প্রতীক ও সংহতির চিহ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে পথ দেখাচ্ছে। মানুষ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদী স্লোগান দেয় এবং একুশের আত্মদানের স্মৃতি স্মরণ করে।







