এই চুক্তি কার্যকর হলে তা হবে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক অস্ত্র ক্রয় চুক্তি। বিষয়টি শুধু যুদ্ধবিমান কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও ভারতে উৎপাদনের বড় পরিকল্পনা। চুক্তির আওতায় প্রায় ১০০টি রাফাল যুদ্ধবিমান ভারতে উৎপাদনের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের সঙ্গে ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা শিল্পের ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্ব আরও গভীর হবে। ভারতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পখাত, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এই চুক্তির বড় প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
রাফাল যুদ্ধবিমান আকাশে আধিপত্য বিস্তার ও নির্ভুল হামলা চালানোর সক্ষমতার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট এই মাল্টি-রোল ফাইটার বিমান দীর্ঘপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র, স্ট্যান্ড-অফ স্ট্রাইক অস্ত্র, উন্নত রাডার ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ব্যবস্থায় সজ্জিত। চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে ফ্রান্সের বাইরে রাফাল ব্যবহারে ভারতের অবস্থান আরও শক্ত হবে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সামরিক সক্ষমতা নতুন মাত্রা পাবে।
বর্তমানে ভারতীয় বিমান বাহিনীর বহরে ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমান রয়েছে। সর্বশেষ ‘সি’ ভ্যারিয়েন্টের বিমানটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সরবরাহ পায়। এগুলো হরিয়ানার আম্বালায় অবস্থিত ১৭ নম্বর স্কোয়াড্রন ‘গোল্ডেন অ্যারোজ’ এবং পশ্চিমবঙ্গের হাসিমারায় অবস্থিত ১০১ নম্বর স্কোয়াড্রন ‘ফ্যালকনস’-এ মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি নৌবাহিনীর জন্য ২৬টি ‘এম’ ভ্যারিয়েন্টের রাফাল কেনার চুক্তিও ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় চারটি টুইন-সিট প্রশিক্ষণ বিমান, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, লজিস্টিক সহায়তা এবং এমআরও সেবা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নৌবাহিনীর এসব রাফাল আইএনএস বিক্রান্ত ও আইএনএস বিক্রমাদিত্য বিমানবাহী রণতরীতে মোতায়েন করা হবে।
রাফাল যুদ্ধবিমান ইতোমধ্যেই বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ব্যবহার করেছে ভারত। গত বছর পেহেলগাম হামলার পর পরিচালিত সামরিক অভিযানে এসব বিমান থেকে আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের তথ্য উঠে আসে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ২৫০ কিলোমিটারের বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল আঘাত হানতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে ওই অভিযানে ভারতের অন্তত একটি রাফাল ভূপাতিত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত যেমন ইরাক যুদ্ধ ও লিবিয়ায়ও রাফাল ব্যবহারের নজির রয়েছে, যা এর কার্যকারিতা ও যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত সক্ষমতার প্রমাণ দেয়।
এই বৃহৎ চুক্তির অংশ হিসেবে ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হচ্ছে। ডাসল্ট অ্যাভিয়েশন ও টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমসের মধ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তির ফলে হায়দরাবাদে একটি আধুনিক উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে। সেখানে রাফাল যুদ্ধবিমানের পেছনের অংশ, ফিউজলাজের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো ও অন্যান্য উপাদান তৈরি হবে। লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০২৮ সাল থেকে মাসে দুটি সম্পূর্ণ ফিউজলাজ তৈরি করা হবে। চূড়ান্ত সংযোজন হবে ফ্রান্সের ডাসল্ট কারখানায়। এর ফলে ভবিষ্যতে ভারত দ্রুতগতিতে রাফাল সরবরাহ পাবে এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতাও বহুগুণ বাড়বে।
একই সঙ্গে ভারত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির পরিকল্পনাও এগিয়ে নিচ্ছে। ডিআরডিওর অধীনে উন্নয়নাধীন অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট প্রকল্পের নৌ সংস্করণ ভবিষ্যতে বিমানবাহী রণতরী থেকে পরিচালনার জন্য প্রস্তুত করা হবে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বিদেশি প্রযুক্তির পাশাপাশি দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার কৌশলেও জোর দিচ্ছে ভারত। সব মিলিয়ে নতুন রাফাল চুক্তি শুধু অস্ত্র কেনার বিষয় নয়, বরং ভারতের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা কৌশল ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের এক বড় মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।








